কানাডার নির্বাচনী হাওয়া : ‘হাউজিং’ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলির ব্যাপক প্রতিশ্রুতি

২০শে সেপ্টেম্বরের কানাডার মধ্যবর্তী নির্বাচনের অন্যতম আলোচিত ইস্যু হাউজিং। সরবরাহের অভাব, একটানা লাগামহীন দাম বৃদ্ধি এবং সর্বোপরি দেশব্যাপী হাউজিং মার্কেটে বিরাজমান অসুস্থ প্রতিযোগিতার কারণে প্রস্তুতি, সামর্থ্য এবং প্রচেষ্টা থাকা স্বত্তেও মার্কেটে সক্রিয় ক্রেতাদের বাড়ী কিনতে না পারা কানাডিয়ানদের ক্রমাগত বিষিয়ে তুলছে। তাই সঙ্গত কারণেই এবারের নির্বাচনে হাউজিং হয়ে উঠে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। বাস্তবতাকে আমলে নিয়ে ভোটারদের আকৃষ্ট করতে প্রতিটি দল তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে হাউজিং সংকট মোকাবেলায় ব্যাপক পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।

প্রধান তিন দলের প্রত্যেকেই তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে পাঁচ দফা পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। তিন দলেরই পাঁচ দফা পরিকল্পনাতে অন্তত দুটি বিষয় একেবারে অভিন্ন। অভিন্ন দুটি পরিকল্পনার প্রথমটি নতুন নির্মাণসহ বাসস্থানের যোগান বৃদ্ধি এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে বিদেশী নাগরিক ক্রেতাদের অ্যাক্টিভিটি সাময়িকভাবে স্থগিত রেখে কানাডিয়ানদের জন্য বাড়ী কেনা সহজ করা। সরবরাহ বৃদ্ধির লক্ষ্যে আগামী চার বছরে নতুন নির্মাণ, সংরক্ষণ এবং মেরামতের মাধ্যমে ১.৪ মিলিয়ন বাড়ীর ব্যবস্থা করার অঙ্গীকার করেছে ক্ষমতাসীন লিবারেল পার্টি। প্রধান বিরোধী দল কনজারভেটিভ পার্টি তাদের নির্বাচনী অঙ্গীকারে আগামী তিন বছরে ১ মিলিয়ন নতুন বাড়ী নির্মাণ এবং সরকারের হাতে থাকা ১৫% রিয়েল এস্টেট অবমুক্ত করে তাতে নতুন নির্মাণ কিংবা সেগুলিকে রেন্টাল প্রোপার্টিতে রূপান্তর করার অঙ্গীকার করা হয়েছে। এনডিপি তাদের পরিকল্পনায় আগামী দশ বছরে অর্ধ মিলিয়ন বাড়ী মার্কেটে আনার অঙ্গীকার করেছে।

লিবারেল এবং কনজারভেটিভ উভয় পার্টিই আগামী দুই বছরের জন্য বিদেশী নাগরিকদের বাড়ী কেনায় নিষেধাজ্ঞা চালুর ব্যাপারে অঙ্গীকার করেছে। এনডিপি অবশ্যই তাদের পরিকল্পনা বিদেশী নাগরিকদের বাড়ী কেনায় নিষেধাজ্ঞার পরিবর্তে ২০% ট্যাক্স আরোপ করার কথা বলেছে।

প্রথম বারের মত বাড়ী ক্রেতাদের জন্য বিদ্যমান ট্যাক্স ক্রেডিট $৫০০০ থেকে $১০,০০০ হাজার করার অঙ্গীকার করেছে লিবারেল পার্টি যার ফলে নতুন বাড়ী ক্রেতারা ট্যাক্স রিটার্নের ক্ষেত্রে ৭৫০$ এর পরিবর্তে ১৫০০$ পাবে। একই অঙ্গীকার করেছে এনডিপি। একই অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে লিবারেল পার্টি রেন্ট থেকে মালিকানা প্রজেক্টের জন্য এক বিলিয়ন ডলার অনুদান রাখার কথা বলছে যেখানে NDP’র অঙ্গীকার হচ্ছে বার্ষিক আয়ের ৩০% এর অধিক বাড়ী ভাড়ায় খরচকারী পরিবারদের জন্য পরিবার প্রতি ৫০০০$ রেন্টাল ভর্তুকি।

এবার ভিন্ন অঙ্গীকারগুলির দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায় লিবারেল পার্টির আরেকটি পরিকল্পনা হচ্চে RRSP গন্ডির বাইরে ‘First Home Savings Account’ নামে করমুক্ত একটি একাউন্টের ব্যবস্থা রাখা যাতে চল্লিশ বছরের কম বয়সী নাগররিকেরা চল্লিশ হাজার ডলার পর্যন্ত সঞ্চয় করে সেটা প্রথম বাড়ি কেনায় ব্যবহার করতে পারেন। এছাড়া লিবারেল পার্টির অপর এজেন্ডাতে আছে ‘Home buyer’s Bill of Rights’ এর নামে একটি আইন প্রণয়নের প্রস্তাব যাতে বাড়ী কেনায় ইন্সপেকশন বাধ্যতামুলক করা হবে এবং “Blind bidding” কে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে।

কনজারভেটিভ পার্টির অন্য অঙ্গীকার গুলির মধ্যে রয়েছে মিউনিসিপালিটিগুলির মাধ্যমে পাবলিক ট্রানজিটের কাছাকাছি এলাকায় অধিক সংখ্যক বাসস্থানের সংস্থান করা। ২য় স্বতন্ত্র পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে ডেভলাপার কর্তৃক রেন্টাল প্রপার্টি বিক্রি করে পুনরায় কেনার ক্ষেত্রে ‘capital gain’কে প্রলম্বিত করার ব্যবস্থা রাখা যাতে দ্রুত তারা নতুন সরবরাহে উৎসাহিত হন।

কনজারভেটিভ পার্টির অঙ্গীকারনামায় বিদ্যমান ২৫ বা ৩০ বছরের Amortisation এর বাইরে ৭-১০ বছর মেয়াদী নতুন একটি মর্টগেজ ব্যবস্থা চালু করার কথা বলা হয়েছে। কনজারভেটিভ পার্টির নির্বাচনী সেলের সাথে এ ব্যাপারে আলাপ করলে তারা জানান যে, পরীক্ষামূলক ৭-১০ বছর মেয়াদী বিকল্প এই ব্যবস্থা অনেক ক্রেতার জন্য ইন্টারেস্টিং হবে বলে তারা মনে করেন।

NDP’র প্রতিশ্রুতিতে ২৫ বছরের Amortisation পিরিয়ডকে ৩০বছরে উন্নীত করার কথা বলা হয়েছে বর্তমানে যেটা শুধুমাত্র ২০% ডাউনপেমেন্ট প্রদানকারী কনভেনশনাল মর্টেজ ক্লায়েন্টরা ভোগ করেন। নতুন এই ব্যবস্থার ফলে ২০% এর কম ডাউনপেমেন্ট দিয়ে বীমাকৃত মর্টগেজে ক্লায়েন্টরাও এই সুবিধা পারেন।

সার্বিক এই প্রতিশ্রুতিগুলির মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হচ্ছে বিদেশী নাগরিকদের উপর নিষেধাজ্ঞা । অফিসিয়াল তথ্য অনুসারে কানাডার রিয়েল এস্টেটে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের ভূমিকা মাত্র ২%, যদিও অনেকে অনুমান করেন যে বাস্তব সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশী। সাময়িকভাবে বিদেশীদের বাড়ী কেনায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে সেটা কতটুকু ফলপ্রসূ হবে তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ আছে। প্রথমতঃ ডেডলাইনের আগে অনেকে কেনার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়বে, অনেকে আবার কানাডায় অবস্থানকারী আত্মীয় স্বজনের নামে প্রপার্টি কেনার চেষ্টা চালিয়ে যাবে। এছাড়া উপরোক্ত প্রতিশ্রুতিগুলির মধ্যে নতুন নির্মাণ এবং সরকারী মালিকানাধীন রিয়েল এস্টেট রিলিজ ব্যতীত আর যেসব প্রতিশ্রুতি আছে সেগুলি জনগণের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রপার্টি কেনার প্রক্রিয়া সহজতর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবে । আশু সরবরাহ বৃদ্ধি ছাড়া উর্ধ্বমুখী বাজার নিয়ন্ত্রণের কোন রাস্তা নেই। যদি সত্যিই সব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়, তাতেও বাজারের বিদ্যমান সমীকরণে খুব একটা পরিবর্তনের সম্ভাবনা নাই।

লেখক : রিয়েল্টর প্রকৌশলী শিহাব উদ্দিন
Email: [email protected]
পূর্বের খবরগুলোসালমান শাহের গানে পড়শী
পরবর্তী খবরগুলোবেতারে তালিকাভুক্ত নিশি

এমন আরও সংবাদ

রিপ্লাই দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন
আপনার নাম লিখুন

seventeen + 13 =

সর্বশেষ বিনোদন