স্যাটেলাইট দূরদর্শনের ইতিহাস

বিশ্বখ্যাত ‘২০০১ : এ স্পেস অডিসি’র কিংবদন্তি লেখক স্যার আর্থার সি ক্লার্ক (১৯১৭-২০০৮) তার একটি লেখায় লিখেছিলেন, পৃথিবীর সীমারেখা থেকে ২২ হাজার ৩০০ মাইল দূরে মহাকাশে ৩টি স্যাটেলাইট (কৃত্রিম উপগ্রহ) প্লাটফর্ম স্থাপন করা যেতে পারে, যেগুলোর মাধ্যমে বিশ্বের সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজতর হবে। ‘এক্সট্রাটেরেস্ট্রিয়াল রিলেস’ শিরোনামের তার সেই লেখাটি ছাপা হয় ওয়্যারলেস ওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিন-এ ১৯৪৫ সালে। এই লেখাটির মাধ্যমেই মানুষ প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ সম্বন্ধে চিন্তা ভাবনা করার সুযোগ পায়। স্যার ক্লার্কই প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ পদ্ধতির স্বপ্নদ্রষ্টা।

তারপর থেকেই কৃত্রিম উপগ্রহ নিয়ে গবেষণার শুরু। ক্লার্কের তত্ত্ব নির্ভর করেই ১৯৫৭ সালে রাশিয়া বিশ্বের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ ‘স্পুটনিক’ মহাশূন্যে পাঠায়। যুক্তরাষ্ট্র ১৯৫৮ সালে ‘এক্সপ্লোরার-১’ নামের কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠায়। মার্কিন এই উপগ্রহের মাধ্যমে পৃথিবীকে ঘিরে থাকা ‘ম্যাগনেটিক রেডিয়েশেন বেল্ট’-এর আবিষ্কার সম্ভব হয়।

‘বাংলা একাডেমি বিজ্ঞান বিশ্বকোষ’-এ কৃত্রিম উপগ্রহ সম্পর্কে বলা হয়েছে, কৃত্রিম উপগ্রহ হলো ‘কোনো গ্রহের চর্তুদিকে কক্ষপথে ঘূর্ণ্যমান নভোযান। এইসব নভোযানের কাজ হলো মহাশূন্য–সংক্রান্ত পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার উপাত্ত সংগ্রহ এবং মহাশূন্য যোগাযোগ রক্ষা করা।…কৃত্রিম উপগ্রহের ঘূর্ণনের পথ বৃত্তাকার বা উপবৃত্তাকার হতে পারে যার কেন্দ্রে বা উপকেন্দ্রে থাকে পৃথিবীর কেন্দ্র।…গবেষণা, যোগাযোগ, পর্যবেক্ষণ, আবহাওয়া ও সামরিক স্যাটেলাইট ছাড়াও রেডিও নেভিগেশন ও জরিপ স্যাটেলাইট আছে। রেডিও নেভিগেশন স্যাটেলাইট জাহাজ, উড়োজাহাজ, স্থলযানকে অবস্থানগত তথ্য দিয়ে থাকে।’

কৃত্রিম উপগ্রহ বিভিন্ন ধরণের হয়ে থাকে। প্রয়োজনের ওপর ভিত্তি করেই স্যাটেলাইটের শ্রেণীবিন্যাস করা হয়। আমাদের বর্তমান স্যাটেলাইট টেলিভিশন বা স্যাটেলাইট দূরদর্শন যোগাযোগ স্যাটেলাইটের ব্যাকরণ মেনে চলে। যোগাযোগ স্যাটেলাইট নামের মহাশূন্যযানকে পৃথিবীর চারদিকের কক্ষপথে স্থাপিত করা হয়। এর মূল কাজ, বেতার সংকেত গ্রহণ ও বিতরণ। এই কৃত্রিম উপগ্রহ বেতার সংকেতগুলোকে বণ্টন, বিন্যাস, নির্বাচন ও গতিপথ নিয়ন্ত্রনের ক্ষমতা রাখে।

যোগাযোগের উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্র প্রথম মহাশূন্যে উপগ্রহ পাঠায় ১৯৫৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর। ‘স্কোর’ নামের সেই উপগ্রহটি পাঠানো হয়েছিল পৃথিবীর স্টেশনগুলো থেকে তথ্য গ্রহণ করে রেকর্ড করার উদ্দেশ্যে। কিন্তু উপগ্রহটি স্টেশনগুলোতে অবস্থান না নেয়া পর্যন্ত বার্তাগুলো প্রেরণ করতে পারতো না। তাই ১৯৬০ সালের ১২ আগস্ট ‘ইকো-১’ নামের একটি উপগ্রহ পাঠানো হয়—যা সঠিক সময়ে বার্তা প্রেরণ ও প্রচার করতে সফল হয়। এটি ছিল ধাতব প্রলেপ দেয়া একটি প্লাস্টিক বেলুন। এর সমস্যা ছিল, এটি নিজের দিকে ধাবমান সংকেতগুলোকেই কেবল গ্রহণ করে প্রচার করতো।

নাসার কারিগরি সহযোগিতায় ১৯৬২ সালের ১০ জুলাই মার্কিন টেলিযোগযোগ বিভাগ ‘টেলস্টার’ নামের উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করে। ‘টেলস্টার’ই বিশ্বর প্রথম সঠিক সময়ে পুনরাবৃত্তিকারী সক্রিয় যোগাযোগ স্যাটেলাইট এবং এর মাধ্যমেই প্রথম ইউরোপ, আমেরিকা, জাপান ও লাতিন আমেরিকার মধ্যে সরাসরি টেলিভিশন সম্প্রচার শুরু হয়। প্রথম দিকে যোগাযোগ স্যাটেলাইট পৃথিবীর টেলিভিশন নেটওয়ার্ক হয়ে বার্তা বিনিময় করতো। এ সুবাদে ১৯৭৬ সালে এইচবিও (Home Box Office) টেলিভিশন নেটওয়ার্ক ক্যাবলের মাধ্যমে ঘর থেকে ঘরে চলচ্চিত্র পৌঁছে দিয়ে ইতিহাস গড়ে। তারপর একই বছর স্টানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালযের অধ্যাপক ও নাসার সাবেক গবেষক এইচ টেলর হাওয়ার্ড ১৯৭৬ সালে ভোক্তা শ্রেণীর জন্য প্রথম ‘ডিটিএইচ’ (Direct To Home) স্যাটেলাইট সিস্টেম তৈরি করেন। ‘ডিটিএইচ’-এর ডিশ এন্টেনা যোগাযোগ স্যাটেলাইট থেকে বার্তা (অনুষ্ঠান) গ্রহণ করে টিভির পর্দায় প্রচার করতে সক্ষয় হয়।

১৯৭৮ সালের মার্চে ‘পিবিএস’ (Public Broadcasting System) জনসাধারণের জন্য প্রথমবারের মতো পাবলিক টেলিভিশন স্যাটেলাইট সিস্টেম নিয়ে আসে। এসময় টিভিআরও (Television Receive Only) প্রযুক্তির উদ্ভাবনের ফলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীও স্যাটেলাইট টিভির সুবিধা পেতে শুরু করে। এইচ টেলর হাওয়ার্ড হাওয়ার্ড এইচবিও’র ছবি পণ্য হিসাবে তার ভোক্তাদের কাছে পৌঁছে দিতে চান, এজন্য তিনি এইচবিও’র সঙ্গে চুক্তি করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। কিন্তু কোম্পানিটি তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। পরে তিনি ইঞ্জিনিয়র বব টেগার্টকে সঙ্গে নিয়ে ‘চ্যাপরেল কমিউনিকেশন্স’ নামে ক্যালিফোর্নিয়ায় একটি সম্প্রচার কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু ক্যাবল টিভি সার্ভিস যাকে বলে—তার গোড়াপত্তন হয় ১৯৭৭ সালে। এর গোড়াপত্তন করেন প্যাট রবার্টসন তার ‘ক্রিশ্চিয়ান ব্রডকাস্টিং নেটওয়ার্ক’ (বর্তমানে এবিসি ফ্যামলি চ্যানেল)–এর মাধ্যমে।

জাপান ও হংকং প্রথম শুধুমাত্র জনসাধারণের জন্য স্যাটেলাইট উৎক্ষেপন করে। যথাক্রমে ১৯৮৬ ও ১৯৯০ সালে। ১৯৮০ সালে ফেডারেল কমিউনিকেশন্স কমিশন ‘সরাসরি সম্প্রচার স্যাটেলাইট’ (ডিবিএস) প্রযুক্তি চালু করে। এর চার বছর পর ক্যাবল আইন পাশ হয়। বর্তমানে পুরো বিশ্ব মহাশূন্যে সক্রিয় যোগাযোগ স্যাটেলাইটের ওপর নির্ভরশীল। ২০১৮ সালে বাংলাদেশও ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট–১’ নামের নিজস্ব ভূস্থির যোগাযোগ ও সম্প্রচার উপগ্রহ পাঠিয়েছে।

হাজার হাজার মাইল দূরত্ব হওয়া সত্ত্বেও স্যাটেলাইটের মাধ্যমে একটি দেশ আরেকটি দেশের সঙ্গে জুড়ে আছে। দেশগুলোর মধ্যে সেতুবন্ধ হিসাবে স্যাটেলাইট কাজ করছে।

লেখকের ইমেইল ঠিকানা : [email protected]

এমন আরও সংবাদ

রিপ্লাই দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন
আপনার নাম লিখুন

three + twenty =

সর্বশেষ বিনোদন