গোরুর ভুঁড়ি কিংবা মাথা মগজের বিষাদ

শিল্পকর্ম : মিশেল কেক

মাকসুদা আক্তারের মেজাজ সব সময় চড়া থাকে। কী কারণে একজন মানুষের মেজাজ এমন গরম কড়াইয়ে তেল টগবগের মতো, এসব ভেবে পায় না নিরীহ স্বামী মোকাররম। সে গ্রামে বড় হওয়া মানুষ। পড়ালেখা করেছে মফস্বলের বিশ্ববিদ্যালয়ে। চাকরি সূত্রে ঢাকায় থাকলেও তার মন পড়ে থাকে গ্রামে। যেখানে তার বৃদ্ধ বাবা মা থাকেন। মোকাররম বিয়ে করেছে সিলেটে। নিজের বাড়ি সিরাজগঞ্জে। সিলেটের মানুষের তো মন ভালো। তার বন্ধু বান্ধব অনেকেই সিলেটের। তাদের কেউ তো এত চড়া মেজাজের না। মাকসুদার মেজাজ এমন কেন? মাকসুদা কি শুরু থেকেই এমন ছিল? মোকাররমের মনে পড়ে না। সংসার বুঝি এরকমই। বিয়ে করার অনেক দিন পর বিয়ে করার শুরুর দিকের ভালোমন্দ ভুলে যায় মানুষ।

যত কারফিউ থাকুক আর মহামারী থাকুক, মোকাররম অন্তত ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাবেই। ঢাকা পেরুলেই যমুনা সেতু। সেতুর ওপারেই তার বাড়ি। সে বাড়ি যেতেই আত্মীয় স্বজন সকলে ছুটে আসে। আর বউ বাচ্চা নিয়ে গ্রামে গেলে তো কথাই নাই। মোকাররমের ছেলেটা ভীষণ সুন্দর। তাকে দেখলেই ভালো লাগে সবার। এ নিয়েও মাকসুদার অভিযোগের শেষ নাই। গ্রামে গেলে নাকি আদরের ছেলেটা কালো হয়ে যাবে। গ্রামের ছেলেদের সাথে মিশলে নাকি ছেলের ব্রেইন নষ্ট হয়ে যাবে। অথচ মোকাররম জানে, তাবৎ দুনিয়ার হর্তাকর্তারা গ্রাম থেকেই শহরে গিয়েছে। ঢাকা শহরের সকল বড়ো মানুষের জন্ম ও বেড়ে ওঠা তো গ্রামেই। গ্রামে গেলে কেন সন্তানের ব্রেইন নষ্ট হবে, মাকসুদার এমন যুক্তির কূল কিনারা পায় না মোকাররম। অথচ মাকসুদা এতই শিক্ষিত যে, এখনও শুদ্ধ বাংলায় কথা বলতে পারে না।

মাকসুদা প্রতি ঈদের এক মাস আগে থেকে মোকাররমকে মানসিকভাবে অত্যাচার করতে থাকে। এবার ঈদে কিন্তু বাড়ি যাওয়া যাবে না। বাবার বাড়িতেও যাবে না, শ্বশুরবাড়িতেও যাবে না। ঢাকায় থাকবে। কোন বাসায়? যে বাসায় তাদের কেউই চেনে না। যে বাসার ছাদে বিয়ের অনুষ্ঠান হলেও তাদের কেউ একবার জিজ্ঞেস করতেও আসে না। অথচ তারা থাকে ছাদের পাশের ফ্ল্যাটে। এই বাসায় ঈদের দিন কেন থাকবে মাকসুদা? মোকাররম বউয়ের শত নোংরা অপমান হজম করে হলেও ট্রেনের টিকিট কাটে।

যেদিন ট্রেনের সময়, সেদিন মাকসুদা ঘরে বসে থাকে, তাকে মোটা অংকের টাকা দিয়ে তারপর বাসা থেকে বের করতে হয়। নিচে গিয়ে সিএনজি অটোরিকশায় উঠেই মাকসুদা শুরু করে কেন গ্রামে যেতে হবে। অটোরিকশা চালক ঘাড় ঘুরিয়ে যদি বলে, গ্রামে যেতে হয়, মাকসুদার ঢোলের বাজনা নতুন মাত্রা পায়। অটোরিকশা চালককে গ্রামের লোক বলে অপমানজনক কথা বলে। সেই চালক ক্ষেপে যায়। মাকসুদা নেমে যেতে চায়। এই করে মোকাররমের ঈদ যাত্রার আজ দশ বছর। ট্রেনে উঠেই ভিড় দেখে মাকসুদার কথা ফুটতে থাকে ভুট্টা ভাজির মতো। যেন তাদের দিকের ট্রেনে ভিড় নাই। ট্রেন থেকে নেমে ভ্যানগাড়িতে যেতে হয়। যেতে যেতে মাকসুদা অনেক আজেবাজে বকে, মোকাররম চুপ করে থাকে। সন্তানের মাথায় হাত বুলায়। আর মিনমিন করে মাকসুদাকে বলে বাড়ি গিয়ে যেন চুপ থাকে। কেন চুপ থাকবে? তার ভাইয়ের বউরা মাইন্ড করবে? ভাইয়ের বউদের সাথে কিসের এত গভীর সম্পর্ক, তাদের জন্য এত মায়া কেন, এইসব বলে সীমা ছাড়িয়ে যায় মাকসুদা আক্তার। মোকাররম ভাবে, তার চুপ থাকাই উত্তম।

ঈদের দিন কোরবানির মাংস যারা কাটাকুটি করে দেয়, এ বাড়ির রীতি হচ্ছে ভুঁড়িটা তাদের বুঝিয়ে দেয় মোকাররমের বাবা। কিন্তু মাকসুদার এই ভুঁড়ি চাই-ই চাই। সে নাছোড়বান্দা। মাংস কাটাকুটি করতে আসা সরল সহজ মন্টু মিয়া ও তার ছেলেরা হাসে আর বলে ‘ভাবিকেই দিয়ে দেন, ভুঁড়িতে কি এমন স্বাদ’। সেই ভুঁড়ি পরিস্কার করে আলাদা প্যাকেট করে ফ্রিজে রাখতে যান মোকাররমের মা। ঘোঁতঘোঁত করে মাকসুদা আক্তার। গ্রামে থাকে, তার আবার ফ্রিজ। কথাটা শুনে সামান্য কষ্ট পান মোকাররমের মা। তিনি বলেন, কোমরে ব্যথা, তিন বেলা রান্না কষ্ট, তাই ছেলেরা ফ্রিজ কিনে দিয়েছে। ছেলেরা দিয়েছে মানে? তাহলে কি মাকসুদার চোখ আড়াল করে মোকাররম ফ্রিজ কিনে দিয়েছে? অথচ মোকাররম বাড়ি এসে ফ্রিজ দেখলো প্রথম। তার ভাই কিনে দিয়েছে, সেটা সে জানেই না। এই ভুঁড়ি নেবে না মাকসুদা। এক কথা দুই কথায় ঝগড়া শুরু করে দেয় মাকসুদা। তার চিৎকারে লজ্জায় মাথা নিচু করে থাকেন মোকাররমের একাত্তর বছর বয়সী অসুস্থ বাবা। তার দিকে তাকিয়ে নীরবে চোখের জল ফেলেন মোকাররমের মা। তিনি টু শব্দটি করেন না। আস্তে করে মাকসুদার কাছে এসে বলেন, ভুঁড়িটা তোমার জন্যই রেখেছি। নিয়ে যেও মা। এমন করে না। মাকসুদার ত্যাজ বেড়ে যায়। এত বড় কথা, আমি কি ভুঁড়ির জন্য পাগল? এত মাংস থাকতে এই ভুঁড়ি নিয়ে চিৎকারে সে ফেটে পড়ে। মাকসুদা উপরের দিকে হাত তুলে আল্লাহকে নালিশ দেয় ‘ইয়া আল্লাহ্‌। এই বাড়ির ভুঁড়ি আমার কপালে দিও না, সামনের বছর আমিই কোরবানি দেব, এই বাড়ির মাংস মুখে নিলে আমি আমার বাপের মেয়ে না, আমার বাপ অন্য কেউ।’

কোনমতে রাত কাটলেও সকালে এ বাড়ি ও বাড়ি থেকে কারা যেন এসে জিজ্ঞেস করে, রাতে এই বাড়িতে চিল্লাইছে কে? ঘর থেকে দরজায় এসে এসব উৎসুক মানুষ দেখে ব্যাগ গোছায় মাকসুদা। আর যদি জীবনে এ বাড়িতে সে এসেছে। অথচ প্রতিবার এই দৃশ্য এ বাড়িতে। মোকাররম বুকে কষ্ট চেপে নিজেও ব্যাগ গুছিয়ে নেয়। এলাকার অটোরিকশা ডাকে। সেই অটোরিকশায় উঠে সারা রাস্তা ভুঁড়ি বিড়ম্বনা নিয়ে বকতে থাকে মাকসুদা। অটোরিকশা চালক এ গ্রামের ছেলে। সে হাসতে হাসতে বলে ‘আমরা তো ভুঁড়ি খাই না, এটা নিয়ে এত কান্নাকাটি করলে মানুষ খারাপ বলবে’। এই তো শুরু। চালককে অপমান করতেই সে ওদের মাঝ রাস্তায় নামিয়ে চলে যায়। কারণ, সে তো আর ঢাকা শহরের চালক না। তার এই দুই প্যাসেঞ্জার না টানলেও চলবে। মাঝরাস্তা থেকে আবার আরেক ভ্যানে উঠে স্টেশনে যায় মোকাররম। মাকসুদা গম্ভীর হয়ে আছে। ঈদের ছুটি এভাবে কাটিয়ে ঢাকায় ফেরে তারা। ফিরতে ফিরতে এক জায়গায় জটলা দেখে। রোড এক্সিডেন্ট। বিড়বিড় করে মাকসুদা। কত মানুষ মারা যায়, এই শয়তান মরে না। মোকাররম টের পায়। তার মনে পড়ে, বউটা অকারণে তাকে অভিশাপ দেয়। রাগ করেই না হয় বলে, তবু সকাল বিকাল মরতে বলে কেন? নামাজে বসেও জায়নামাজে হাত তুলে মৃত্যুর অভিশাপ দেয়। ইফতার সাজিয়ে সামনে নিয়েও অভিশাপ দেয়। আজ মোকাররম মরে গেলে কাল মাকসুদার কে থাকবে, তা কি ভাবে সে? মোকাররমের বুক ভারী হয়ে আসে। সে মাকসুদাকে বুঝতে দেয় না।

ঢাকায় আসতেই দুদিন পর বাসার কলিংবেল। গ্রাম থেকে সেই ভুঁড়ির টোপলা, সাথে অনেক মাংস পাঠিয়েছেন মোকাররমের মা। হাতে পেয়ে বেশ খুশি হয় মাকসুদা। রান্না করে রাখে। রাতে মোকাররমের টেবিলে সেই রান্না এগিয়ে দিতেই মোকাররম বলে দেয়, সে এসব খাবে না। কী অদ্ভুত প্রক্রিয়ায় মাকসুদা গপগপ করে সেসব খেয়ে ওঠে।

তারপর দিন যায়, মাস যায়, বছর না ঘুরতেই জানা যায়, মোকাররম অফিসের কাজে ঢাকা থেকে ফেরার পথে রোড এক্সিডেন্টে মারা গেছে। তারপর থেকে সাত বছরের ছেলেকে নিয়ে একা কষ্ট করে জীবনযুদ্ধ করে যাচ্ছে মাকসুদা। মোকাররম মারা যাবার পর বিয়ে করেছিল সে, কিন্তু সে বিয়ে তিন মাস টেকে নাই। ফের ঢাকায় একটা পুরনো বাড়িতে এসে জায়গা নিয়েছে। কম মূল্যে সেই বাড়িতে থাকে ছেলেকে নিয়ে। অথচ দুই বছর আগেও যখন মোকাররম বেঁচে ছিল, কি দারুণ পরিপাটি বড় এপার্টমেন্টে থাকতো তারা।

চোখের সামনে কোরবানির ঈদ আসে। মাকসুদার ছেলেটা বাড়ির দারোয়ানের ছেলের সাথে বাড়িওয়ালার কোরবানির গোরুকে ঘাস ছিঁড়ে খাওয়ায়। জানালা দিয়ে সেই দৃশ্য দেখে তার মনে পড়ে মোকাররমের মুখ, তার গ্রামের কথা। তাদের গ্রামে কি বড়ো বড়ো গোরু কোরবানি দিতো, কেন জানি মাকসুদার চোখে জল গড়িয়ে পড়ে। আর কেন জানি তার মনে পড়ে সেই ভুঁড়ি ফেলে আসার কথা। আরও মনে পড়ে তার শপথের কথা, সে যে ওই বাড়ির মাংস মুখে তুলবে না। মাকসুদার আঁচল ধরে ছেলেটা জিজ্ঞেস করে ‘মা, নিচে বাড়িওয়ালার গোরুকে ঘাস খাওয়াইলাম, আমরা কখনও কোরবানি দেব না?’ মাকসুদা ছেলেকে বুকের মধ্যে চেপে ধরে আল্লাহকে অভিযোগ দেয় ‘আল্লাহ্‌ তুমি এমন কেন, তোমার দুনিয়ায় আর মানুষ ছিল না, মোকাররমকেই তোমার নিতে হবে?’

এমন আরও সংবাদ

রিপ্লাই দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন
আপনার নাম লিখুন

fifteen + 2 =

সর্বশেষ বিনোদন