‘মরণোত্তম’ এবারের ঈদের অন্যতম আলোচিত কাজ

বই থেকে ভিজ্যুয়াল কন্টেন্ট নির্মাণ নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নিয়মিত চর্চা থাকলেও আমাদের দেশের নির্মাতাগণ প্রায়ই হা-হুতাশ করেন গল্পের অভাবে। যার ফলে অসংখ্য গল্পের ভাণ্ডার এই বাংলায় ভালো গল্পের কন্টেন্ট দেখা যায় কালেভদ্রেই। এনিয়ে আমাদের দেশের দর্শকদের মধ্যে একটা আক্ষেপ ছিল বহুদিন ধরে। যদিও গত কয়েক বছর বেশ কয়েকজন মেধাবী নির্মাতা পুরোনো ধ্যান ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে ভালো গল্প বলার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এরই ধারাবাহিকতায় এবারের ইদে বঙ্গবিডি (BongoBD) থেকে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে BOB প্রজেক্টের মাধ্যমে বই থেকে গল্প নির্মাণের। গতকাল প্রচারিত হলো লেখক সাদাত হোসাইনের উপন্যাস ‘মরণোত্তম’ অবলম্বনে একই নামের টেলিফিল্মটি। পরিচালনা করেছেন সঞ্জয় সমদ্দার। কেন্দ্রীয় চরিত্রে ছিলেন ইলিয়াস কাঞ্চন।

গল্পটি একজন আজিজ মাস্টারের একক যুদ্ধের। গ্রামের দবির খাঁ হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক তার স্কুলের এমপিও ভুক্তির দাবিতে দৌড়াদৌড়ি করেন। কিন্তু কন্যাসম ছাত্রী কোহিনূর যখন স্থানীয় চেয়ারম্যানের ছেলে রাকিব কর্তৃক উত্যক্ত ও ধর্ষণের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করে তখন আজিজ মাস্টারের যুদ্ধটা হয়ে যায় কোহিনূরের পিতা হয়ে ন্যায় বিচার আদায়ের। শেষে কি ন্যায় বিচার পায় মাস্টার? না-কি গতানুগতিক ধারায় হারিয়ে যায় বিচারের দাবি? কোহিনূর কি আসলেই ধর্ষণের শিকার হয়েছিল?

লেখক সাদাত হোসাইন বইতে যে বার্তা দিতে চেয়েছেন, সেটিকে ধারণ করেই বই থেকে নির্মিত এই কন্টেন্টে নির্মাতা সঞ্জয় সমদ্দার নিজস্ব মেথডে দারুণ কিছু বার্তা দিতে চেয়েছেন যেটি ছিল সবচেয়ে ইতিবাচক দিক। সেই সাথে কাহিনীর একদম শেষে উন্মুক্ত হয় ‘মরণোত্তম’ শব্দের যথার্থতা। কলুষিত এই সমাজে ন্যায়ের পথে থাকা প্রতিটা মানুষকে পদে পদে কি পরিমাণ লাঞ্ছনার শিকার হতে হয় সেটিই নতুন করে আরেকবার দেখিয়েছেন সঞ্জয়’দা। একইসাথে সমাজে কর্তৃত্ব করা ব্যক্তিরা কিভাবে নিজের ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের পূজনীয় করে রাখে সেটির প্রদর্শনীও দেখা গেল। একইসাথে স্যোশাল মিডিয়ার অপব্যবহার, হলুদ সাংবাদিকতার ব্যাপারটাও দর্শকের মগজে টুকে দিয়েছেন টেকনিক্যালি। গরিব বা সামাজিকভাবে অসহায় ব্যক্তিদের নাগরিক সুবিধা দিতে রাষ্ট্র কতটা ভঙ্গুর সেটির প্রতিফলন দেখিয়েছেন বেশ সাবলীলভাবেই। বেশ ভালো একটি সাহসী প্রোডাকশন।

তবে নির্মাণের কিছু বিষয় আমার নজর এড়ায়নি। যেমন দবির খাঁ মেমোরিয়াল হাইস্কুলে কি কেবল দশম শ্রেণির ক্লাসই হয়? কিংবা স্কুলে কি প্রধান শিক্ষকের বাইরে কেবল একজনই সহকারী শিক্ষক? ব্যাপারটাতে আরেকটু স্বাভাবিকত্ব বজায় থাকলে মন্দ হত না। একইভাবে কোহিনূরের ক্ষেত্রেও। যদিও স্ক্রিনে কোহিনূরকে পিতৃহীন হিসেবেই দেখা গেছে, এক্ষেত্রে যদি তার মায়ের একটু উপস্থিতি পাওয়া যেত, তাহলে আরেকটু ভালো লাগত। ধর্ম নিয়ে লেখালেখির জন্য ভুবনের ছেলের ব্যাপারে চেয়ারম্যান সাহেবের অভিযোগটা জোড়ালো মনে হয়নি। কারণ সাধারণত গ্রামাঞ্চলে এ ধরণের ইস্যুতে সাধারণ জনগণের প্রতিক্রিয়া হয় তাৎক্ষণিক ও উগ্র, বল মেরে জানালার গ্লাস ভাঙার মতো হালকা বিচার দেয়ার মতো নয়। বরং একটা বড় শোরগোল বেঁধে যদি যেত, সেক্ষেত্রে যে উদ্দেশ্যে চেয়ারম্যানের আগমণ সেটি আরো প্রাণ পেত। তবে হ্যাঁ, যদি চেয়ারম্যানের আগমণ হেতু হয়ে থাকে মিছিমিছি একটা কথা বলে উদ্দেশ্য হাসিল, সেক্ষেত্রে ব্যাপারটা মানা যায়। তবে তখন ভুবনকেও ছেলের ব্যাপারে অজ্ঞ হতে হতো।

লোকেশন সিলেকশন, প্রপ্স, সিনেমাটোগ্রাফি, কালার, এডিট ভালো লেগেছে। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকে আরেকটু বেটার করার সুযোগ ছিল সম্ভবত।

অভিনয়ে কেন্দ্রীয় চরিত্রে ইলিয়াস কাঞ্চন ভালোই করেছেন, যদিও ডায়ালগ ডেলিভারিতে তার পুরোনো বাংলা সিনেমার একটা টোন লক্ষ্য করা গিয়েছে, যা কিছুটা হলেও ন্যাচারালিটিতে বাধা দিয়েছে। তারপরেও পরিচালক তার মধ্য থেকে বয়সী চরিত্রটা বের করে এনেছেন, এজন্য পরিচালককে সাধুবাদ দিতেই হয়। খল চরিত্রে শহিদুজ্জামান সেলিম সব সময়ই দারুণ। এখানেও তেমন, বিশেষ করে কোহিনূরের আত্মহত্যার পর আজিজ মাস্টারের সাথে মুখোমুখী হবার পর তার যে চেঞ্জিং, পালটা চেঞ্জিং তা অবশ্যই পুরো কাহিনীর অন্যতম সুন্দর দৃশ্য। কোহিনূর চরিত্রে মহিমার অভিনয় ভালো ছিল, তবে তার লুক বেশ পশ লেগেছে, স্কিনে আরেকটু রুরাল টোনিং করলে হয়তো ভালো লাগতো তুলনামূলক।

নিজে থিয়েটার কর্মী ও অভিনয় শিল্পী হওয়ার সুবাদে যেকোনো ভিজ্যুয়াল কন্টেন্টে প্রতিটা ক্যারেক্টারে নিজেকে বসিয়ে সাধারণত দর্শকের দৃষ্টিতে দেখি। সে বিবেচনায় মূল চরিত্রগুলো বাদে ছোটো চরিত্র কিংবা পাসিং চরিত্রগুলো ঠিকঠাক লাগেনি আমার কাছে। কিছুটা মেকি মেকি। যেমন- ভুবনের কথাই ধরা যাক। চেয়ারম্যানের সাথে কথাবার্তার সময় অভিব্যক্তিটা পুরোপুরি পারফেক্ট লাগেনি। একই কথা বলা যায় আজিজ মাস্টারের মেয়ের সাথে শেষ দিকের কথোপকথনে। মেয়ের কথাগুলো সাবলীল ছিল না। অন্যতম চরিত্র রাকিব চরিত্রটাও ভালো ছিল, চেয়ারম্যানের ছেলে হিসেবে নেগেটিভিটি ভালোই দেখিয়েছে সে। তার সঙ্গীদের নেগেটিভ এক্সপ্রেশন আরেকটু বোল্ড আশা করেছিলাম। সবচেয়ে মন্দ লেগেছে পুলিশের অভিনয়। ঢাকার রাস্তায় ডিউটিরত পুলিশ এক্সপেশান ও ভয়েসে সাধারণত এত সফট ও কমিকাল হয় না। ভালো লেগেছে অল্প সময়ের জন্যে স্ক্রিনে আসা ইউটিউবার চরিত্রটি। তবে সবচেয়ে ভালো লেগেছে আসাদ চরিত্রে থাকা ইমতিয়াজ বর্ষনের অভিনয়। স্পেশালি তার ভয়েস অ্যাক্টিং। শেষের ডায়লগের সাথে অভিব্যক্তিটা খুবই সুন্দর হয়েছে।

মরণোত্তমের কস্টিউম ডিপার্টমেন্টকেও ধন্যবাদ দিতে হয়। সুন্দর কাজ দেখিয়েছে এই ডিপার্টমেন্ট।

সবমিলিয়ে ‘মরণোত্তম’ এবারের ঈদের অন্যতম আলোচিত কাজ। বই থেকে কন্টেন্ট নির্মাণের যে উদ্যোগ বঙ্গ নিয়েছে, এই প্রক্রিয়া যদি চলমান থাকে, তবে সঞ্জয়’দার মতো তরুণ মেধাবী নির্মাতারা যেমন দারুণ দারুণ গল্পে নিজেদের চিন্তা ও প্রচেষ্টাকে বাস্তবে রূপ দিয়ে দর্শকের সামনে আনতে পারবেন, তেমনি দর্শকের জন্যেও ভালো গল্পের কাজ দেখতে না পারার আক্ষেপ দূর হবে অচিরেই। একই সাথে দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে থাকা অনেক মেধাবী অভিনেতাদের জন্যেও খুলে যাবে ভালো ভালো গল্পে কাজের দুয়ার। ইন্ডাস্ট্রিও হবে সমৃদ্ধ। লেখকবৃন্দও পাবেন অনুপ্রেরণা, খুঁজবেন ভালো গল্পের রসদ।

‘মরণোত্তম’ দেখা যাবে বঙ্গ অ্যাপে ও বঙ্গের অফিসিয়াল সাইটে। সাদাত হোসাইনের লেখা বইটি প্রকাশ করেছে অন্যপ্রকাশ। বইটি সকল অনলাইন শপেই পাওয়া যাচ্ছে।

লেখক : শাহাদাত সাব্বির 
[email protected]

এমন আরও সংবাদ

রিপ্লাই দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন
আপনার নাম লিখুন

12 + three =

সর্বশেষ বিনোদন